বিশ্বকাপ
ফুরিয়ে আসছে আন্ডারডগদের জাদু?

বেলজিয়ামের কাছে হেরে রাউন্ড অব বত্রিশ থেকেই বিদায় নিয়েছে সেনেগাল।
উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপ শুরুর আগে থেকেই সবচেয়ে আলোচিত দল ছিল কেপ ভার্দে। নীল জলরাশি বেষ্টিত এই দ্বীপরাষ্ট্রটি মাঠের খেলাতেও দেখিয়েছে চমক। গ্রুপপর্বে তারা কোনো ম্যাচ না হেরে বিশ্বকাপের ৯৬ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে ছোট দেশ হিসেবে নকআউট পর্বে খেলার রেকর্ড গড়েছে। স্পেনের মতো দুর্ধর্ষ দলকেও রুখে দিয়েছে ফিফা র্যাংকিংয়ের ৬৪ নম্বরে থাকা দলটি। নকআউটে কেপ ভার্দের সামনে এখন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। গ্রুপপর্বে এমন অনেক চমকই দেখিয়েছে বিশ্বকাপ। সবচেয়ে ছোট দেশ হিসেবে বিশ্বকাপ খেলতে এসে প্রথম পয়েন্ট অর্জন করেছে কুরসাও। পরাশক্তি ইংল্যান্ডকে বাগে এনে পয়েন্ট কেড়ে নিয়েছে ৬৫ নম্বর দল ঘানা। শুধু তা-ই নয়, দক্ষিণ কোরিয়া আর ইকুয়েডরের মতো বাঘা বাঘা দলকে কাঁপিয়ে দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার মতো পিছিয়ে থাকা দলগুলো। কিন্তু নকআউট পর্ব শুরু হতেই চেনা বাস্তবতার মুখোমুখি আন্ডারডগরা। ফুরিয়ে আসছে ছোট দলগুলোর জাদু; মাঠের নিয়ন্ত্রণ আবারও চলে যাচ্ছে ফুটবল বিশ্বের পরাশক্তিদের পায়েই।
রাউন্ড অব বত্রিশের শুরুতে র্যাংকিংয়ের ৫৪ নম্বর দল দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে শেষ ষোলো নিশ্চিত করে বিশ্বকাপের অন্যতম আয়োজক কানাডা। তথা ফিফা র্যাংকিংয়ের ৩০তম দলটি ২৪ বছর পর বিশ্বকাপ নকআউটে প্রথম জয় পেয়েছে। শেষ ষোলোতে তাদের সামনে এখন নেদারল্যান্ডসকে বিদায় করা মরক্কো। অন্যদিকে আইভরি কোস্টকে ২-১ গোলে হারিয়ে শেষ ষোলোতে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের মুখোমুখি আর্লিং হালান্ডের নরওয়ে। র্যাংকিংয়ের দশম অবস্থানে থাকা মেক্সিকোর সঙ্গে পেরে ওঠেনি ২৪তম দল ইকুয়েডর। হেরেছে ২-০ ব্যবধানে। অথচ দক্ষিণ আমেরিকান বিশ্বকাপ বাছাইয়ে তারা আর্জেন্টিনার পরই দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছিল। গ্রুপপর্বে পর্তুগালকে রুখে দিয়ে এবং উজবেকিস্তানকে হারিয়ে ৫২ বছর পর বিশ্বকাপের নক-আউটে উঠেছিল ডিআর কঙ্গো। শেষ বত্রিশে ইংল্যান্ডের সঙ্গে তুমুল লড়াই করেও আফ্রিকার দেশটি হেরে গেছে ২-১ ব্যবধানে। একইদিনে সেনেগালকে গুড়িয়ে দিয়েছে বেলজিয়াম। আর স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হেরে গেছে বসনিয়া অ্যান্ড হার্জেগোভিনা। রাউন্ড অব বত্রিশে অপেক্ষা করছে আরও কিছু অসম লড়াই। যেমন আর্জেন্টিনা- কেপভার্দে, কলম্বিয়া-ঘানা, কানাডা-মরক্কো এর বড় উদাহরণ। মাঠের খেলায় অলৌকিক কিংবা নাটকীয় কিছু না ঘটলে ছোট দলগুলোর স্বপ্নযাত্রা শেষ হয়ে যাবে এই পর্বেই।
ফিফার টেকনিক্যাল স্টাডি গ্রুপের (টিএসজি) দাবি, ৪৮ দলের বিশ্বকাপ আয়োজন করায় ছোট দলগুলো নিজেদের প্রমাণের সুযোগ পাচ্ছে। তাদের লড়াকু মনোভাবের কারণে বড় দলগুলো দাপট দেখিয়ে সহজে জয় তুলে নিতে পারছে না। বেড়েছে আপসেটের সংখ্যা। এতে বিশ্বকাপ আরও জমজমাট হয়েছে বলে ফিফার দাবি। তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, ছোট দলগুলো একটা পর্যায়ের পর আর এগোতে পারে না। বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের ম্যাচগুলোতে প্রতি সেকেন্ডে কৌশলগত পরিবর্তন আসে। বড় দলগুলোর খেলোয়াড়েরা নিয়মিত ইউরোপের শীর্ষ লিগ ও চ্যাম্পিয়নস লিগের মতো উচ্চ-স্নায়ুচাপের ম্যাচে খেলে অভ্যস্ত। অন্যদিকে ছোট দলগুলোর ক্ষেত্রে এই অভিজ্ঞতার ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাছাড়া একটি দীর্ঘ টুর্নামেন্টে শুধু প্রথম একাদশ দিয়ে টিকে থাকা অসম্ভব। বড় দলগুলোর সাইড বেঞ্চ অত্যন্ত শক্তিশালী হওয়ায় চোট বা কার্ডের সমস্যায় তারা সহজে বিকল্প খুঁজে নিতে পারে। কিন্তু ছোট দলগুলোর মূল ২-১ জন তারকা খেলোয়াড় ছিটকে গেলে বা ক্লান্ত হয়ে পড়লে পুরো দলের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়।
টুর্নামেন্ট যতই এগোতে থাকে, ততই বড় দলগুলো বদলাতে থাকে কৌশল। তাই কোনো ছোট দল গ্রুপ পর্বে অঘটন ঘটালেও দীর্ঘমেয়াদে বড় দলগুলোর হাই-প্রেসিং ফুটবল ও শারীরিক সক্ষমতার সঙ্গে তারা পেরে ওঠে না। এ তো গেল টেকনিক্যাল ও পারফরম্যান্সের বিষয়, অবকাঠামোর দিক দিয়েও ছোট দলগলো অনেক পিছিয়ে। গোল ডটকম- এর এক প্রতিবেদন থেকে উদ্বৃত করা যেতে পারে-‘ইউরোপ ও ল্যাটিন আমেরিকার শীর্ষ দলগুলো যেভাবে আধুনিক স্পোর্টস সায়েন্স, ডাটা অ্যানালিটিক্স এবং বিশ্বমানের কোচিং প্যানেল ব্যবহার করতে পারে, আফ্রিকার কেপ ভার্দে বা এশিয়ার জর্ডানের পক্ষে সীমিত বাজেটে তা সম্ভব হয় না।’ ফলে কাগজে-কলমে বিশ্বকাপের পরিধি বাড়লেও মাঠের লড়াইয়ে এখনও আধিপত্য ধরে রেখেছে সেই চেনা পরাশক্তিগুলোই। এই বৃত্ত ভাঙতে হলে ছোট দলগুলোর কেবল বিশ্বকাপের টিকিট পেলেই চলবে না; বরং ফুটবল কাঠামোর আমূল পরিবর্তন ঘটনোর পাশাপাশি আধুনিক ফুটবলের জটিল রণকৌশলের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে।








