লোথার ম্যাথিউসের কলাম
ম্যারাডোনার চেয়েও এক ধাপ ওপরে মেসি

সংগৃহীত ছবি
লিওনেল মেসির সঙ্গে আমার প্রথম দেখার কথা খুব ভালো করেই মনে আছে। দিনটি ছিল ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট, বুদাপেস্টে। আর সেই ম্যাচটি ছিল সত্যিই স্মরণীয়— ম্যাচের সঙ্গে জড়িত সবার জন্যই!
আমি তখন হাঙ্গেরির জাতীয় দলের কোচ ছিলাম। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে আমরা একটি প্রীতি ম্যাচ খেলেছিলাম, সেই ম্যাচে তারা ২-১ ব্যবধানে জিতেছিল। হার্নান ক্রেসপো, রবার্তো আয়ালা ও পাবলো সোরিন ছিলেন তখনকার তারকা। আর্জেন্টিনার এখনকার কোচ লিওনেল স্কালোনি তখন খেলছিলেন রাইট-ব্যাক হিসেবে। কিন্তু ম্যাচের আগে সবার মুখে আলোচনা ছিল এফসি বার্সেলোনার সেই বিস্ময়বালককে নিয়ে, যে আন্তর্জাতিক ফুটবলে পা রাখতে যাচ্ছিল।
ম্যাচের প্রায় এক ঘণ্টা পর মেসি বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নামে আর তার সব শক্তি ও গতি ঢেলে দেয়। প্রথম ছোঁয়া, ড্রিবলিং— আর তখনই আমার এক খেলোয়াড় তাকে টেনে ধরে রাখার চেষ্টা করে। মেসি কনুই দিয়ে পেছনে আঘাত করায় জার্মান রেফারি ডক্টর মার্কাস মের্ক তাকে সরাসরি লাল কার্ড দেখান। মেসির প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচটি মাত্র ত্রিশ বা চল্লিশ সেকেন্ড স্থায়ী হয়েছিল। কিন্তু সেটি ছিল এক রূপকথার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সূচনা।
মেসিকে সবসময় ডিয়েগো ম্যারাডোনার সঙ্গে তুলনা করা আর্জেন্টিনার সেই জাতীয় বীর, যিনি ২০২০ সালে বড় অসময়ে মারা গেছে। ম্যারাডোনা আমার প্রতিদ্বন্দ্বী, তবে বন্ধু ছিল; যাকে আমি এখনো শ্রদ্ধা করি। নিঃসন্দেহে আর্জেন্টাইনরা ডিয়েগোকে চিরকাল ঈশ্বরের মতো পূজা করবে। কিন্তু মেসি এখন তাদের হৃদয়ে ঠিক ম্যারাডোনার পাশেই জায়গা করে নিয়েছে। আমার চোখে, মেসি এখন ম্যারাডোনার চেয়েও এক ধাপ ওপরে।
ডিয়েগোর মতোই মেসিও একজন জিনিয়াস, সে বিশ্ব ফুটবলকে শাসন করছে। ম্যারাডোনা এক দশকের কিছু বেশি সময় ধরে এটি করতে পেরেছে, কিন্তু তার ক্যারিয়ার ছিল বিতর্কে ঠাসা। ডোপ টেস্টে পজিটিভ হয়েছিল সে। মেসি আলাদা, অনেক বেশি মাটির মানুষ। বলতে গেলে একেবারেই বিতর্কহীন— ১০ বছর আগের ট্যাক্স-সংক্রান্ত সমস্যাটি বাদ দিলে।
২০ বছর ধরে লিওনেল মেসি ফুটবলের এই সর্বোচ্চ স্তরে খেলে যাচ্ছে। এটি অনন্য এবং সত্যিই বিশ্বমানের! আর্জেন্টিনা এবং ক্লাব ফুটবলের হয়ে জেতার মতো যা কিছু আছে, তার সবই মেসি জিতেছে। ২০২২ সালের ফাইনালে সে বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার আমার বিশ্বরেকর্ডটি ভেঙে দেয়। আমি স্টেডিয়ামে উপস্থিত ছিলাম আর এই অর্জনে রোমাঞ্চিত হয়েছিলাম। এখন সে বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি গোলের মিরোস্লাভ ক্লোসার রেকর্ডটিও ছাড়িয়ে গেছে। লিওনেল মেসির খেলা দেখা আমার কাছে শুধু ফুটবলীয় আনন্দই নয়; এটি আমাকে প্রতিবার ডিয়েগো ম্যারাডোনার সেই সোনালি দিনগুলোর কথাও মনে করিয়ে দেয়।
কাতারে বিশ্বকাপ জয়ে মেসির ক্যারিয়ার মূলত পূর্ণতা পায়; শুধু এই মর্যাদাপূর্ণ ট্রফিটিই বাকি ছিল, বিশেষ করে নিজের দেশে নিঃশর্ত স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য। কিন্তু সে এখনো আরও কিছু অর্জন করতে চায় আর সেটি করছেও। গত ডিসেম্বরেই মেসি মায়ামির হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের চ্যাম্পিয়নশিপ (এমএলএস) জিতেছে। এই বিশ্বকাপেও তাকে দেখে এমন মনে হচ্ছে না যে তার ক্যারিয়ার শেষের পথে।
লিওনেল মেসির খেতাব বা রেকর্ডগুলো যা ম্যারাডোনার চেয়েও বেশি, সেগুলো আমাকে যতটা না টানে, তার চেয়ে বেশি মুগ্ধ করে ৩৯ বছর বয়সেও ফুটবলের প্রতি তার এই আবেগ, আনন্দ এবং ছন্দ। এজন্য ‘ম্যাজিক’ বা ‘জাদু’ শব্দটাই বেশি উপযুক্ত! ও আসলে মাঠে খুব বেশি দৌড়ায় না; কিন্তু বল যখন তার পায়ে থাকে, তখন অসাধারণ কিছু ঘটে। সে বলকে ভালোবাসে আর বল ভালোবাসে মেসিকে। যেভাবে সে বলকে নিয়ন্ত্রণ করে, সেই সূক্ষ্মতা, সেই টেকনিক, বল যেন তার আদেশ মেনে চলে!
আমাদের কয়েকবার দেখা হয়েছে, যেমন ফিফা বর্ষসেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে। সে সবসময় খুব বিনয়ী। সবসময় আমার সঙ্গে কথা বলার জন্য কিছুটা সময় বের করে নিত, সম্ভবত এই কারণে যে মেসি তার আদর্শ ম্যারাডোনার সঙ্গে আমার অসাধারণ সম্পর্কের কথা জানে। ডিয়েগো এবং আমি পরপর দুটি বিশ্বকাপের ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিলাম— ১৯৮৬ সালে মেক্সিকো সিটিতে সে আর্জেন্টিনার হয়ে জিতেছিল আর ১৯৯০ সালে রোমে আমরা জিতেছিলাম। এ তথ্যটিই অনেক কিছু বলে দেয়। তবে আমাদের সম্পর্ক এর চেয়েও অনেক গভীর ছিল।
ম্যারাডোনার সঙ্গে আমার প্রথম দেখার কথাও খুব ভালো মনে আছে। সেটি ছিল ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ, আমার ২১তম জন্মদিনের তিন দিন পর। জন্মদিনের দিন আমি রিও ডি জেনিরোর মারাকানা স্টেডিয়ামে ব্রাজিলের বিপক্ষে প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতে নেমেছিলাম এবং ব্রাজিলের প্লে-মেকার জিকোকে বোতলবন্দি করে রেখেছিলাম। এরপর বুয়েনস আইরেসে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ম্যাচে আমি ডিয়েগোর বিপক্ষেও একই কাজ করতে সফল হই।
সেটিই ছিল একে অন্যের বিপক্ষে আমাদের অনেক ম্যাচের প্রথমটি, তা জাতীয় দলের হয়েই হোক বা পরে নাপোলির বিপক্ষে ইন্টার মিলানের হয়েই হোক। মাঠের প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং আমাদের দুজনের তীব্র জেদের পরও সেগুলো সবসময়ই ছিল মার্জিত লড়াই এবং বছরের পর বছর ধরে তা থেকে আমাদের বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল।
১৯৯২ সালে ডিয়েগো যখন তার প্রথম দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে সেভিয়া এফসিতে যোগ দেয়, তখন তার প্রত্যাবর্তনকে স্মরণীয় করে রাখতে একটি প্রীতি ম্যাচ খেলতে চেয়েছিলাম। উলি হোয়েনেস সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেন। আমরা সেখানে উড়ে গেলাম, একটি দারুণ ম্যাচ খেললাম এবং পরে একটি চমৎকার পার্টি নাইট কাটালাম। কারণ, ডিয়েগো একজন পেশাদারের মতোই পার্টি করতে পারত! বহু বছর পর সে আমার বিদায়ী ম্যাচে খেলেছিল আর আমি তার বিদায়ী ম্যাচে খেলেছিলাম।
আমরা আসলে একই দলে একসঙ্গে খেলেছিলাম মাত্র একবার। ১৯৮৮ সালে ন্যান্সিতে মিশেল প্লাতিনির বিদায়ী ম্যাচের জন্য কোচ জিওভানি ট্রাপাতোনি একটি বিশ্বমানের অল-স্টার দল গঠন করেছিলেন, যেখানে ম্যারাডোনা আর আমি ছিলাম। খেলার সময় ডিয়েগো এমন একটি থ্রু বল বাড়িয়েছিল, ঠিক যেমনটি ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে হোর্হে বুরুচাগা আমাদের বিপক্ষে করেছিল আর ৩-২ গোলের ব্যবধানে জয় এনে দিয়েছিল।
পরিবর্তন বলতে শুধু এটাই ছিল যে, এবার বুরুচাগার জায়গায় আমি ছিলাম এবং ম্যারাডোনার অ্যাসিস্ট থেকে গোলটি করেছিলাম। সে তখন আমার বুট পরে খেলছিল, যা আমি ধার দিয়েছিলাম। কারণ সে নিজের বুট আনতে ভুলে গিয়েছিল। সেই বুটজোড়া, যা তার স্বাক্ষর করা হালকা ফিতাসহ আমাকে ফেরত দিয়েছিল। আমি সেভাবেই রেখে দিয়েছিলাম এবং ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালের প্রথমার্ধে একটি বুট ছিঁড়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত ওগুলো পরেই খেলা চালিয়ে গিয়েছিলাম। হাফটাইমে বুট বদলানোর কারণে আমি ঠিক আত্মবিশ্বাসী বোধ করছিলাম না এবং অ্যান্ডি ব্রেহমেকে সেই জয়সূচক পেনাল্টিটি নিতে দিয়েছিলাম। বাকিটা তো ইতিহাস।
১৯৮৬ সালের ফাইনালে ম্যারাডোনার যে জার্সিটি আমি তার সঙ্গে বদল করেছিলাম, সেটি মাদ্রিদের আর্জেন্টাইন দূতাবাসে ফেরত দিয়ে এসেছি; কারণ আমি বিশ্বাস করি, এটি আর্জেন্টিনার জনগণের প্রাপ্য। আর ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে তার জার্সিটি ডর্টমুন্ডের জার্মান ফুটবল মিউজিয়ামে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। ফ্রাঙ্ক মিল— যিনি দুঃখজনকভাবে আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। আমাকে ডিয়েগোর কাছ থেকে ওটা এনে দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন।



